
সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করার লক্ষ্য নিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নামে বৃহৎ কর্মসূচির অঙ্গীকার করেছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জনগণের রায়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই এবার এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে জোর তৎপরতা শুরু করেছেন। দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন এবং পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে জোর দিয়েছেন। নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা জোরদার করতে ফ্যামিলি কার্ড পরীক্ষামূলকভাবে রোজার ঈদের আগেই চালু করতে চান তিনি। বিএনপির ঘোষণায় বলা হয়েছিল, দলটি ক্ষমতায় এলে ধাপে ধাপে দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ৫০ লাখ অতি দরিদ্র পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। কার্ডটি পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ইস্যু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা করবে বলে মনে করছে দলটি।
নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আক্ষরিক অর্থে বাস্তবায়নে শুরুতে আট বিভাগের আটটি উপজেলায় এই কার্ড দিতে চায় নতুন সরকার। সরকারের দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে প্রধান করে ১৫ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, যাতে বলা হয়েছে রোজার ঈদের আগেই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। সে লক্ষ্যে ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে কমিটিকে।
নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতিতে যে ৯ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে ইশতেহার দিয়েছিলেন সেটির অন্যতম ছিল ফ্যামিলি কার্ড। নতুন প্রধানমন্ত্রী তার বিভিন্ন জনসভা ও আলোচনায় এই কার্ডের বিষয়টি তুলে ধরেন।
দলের তরফে বলা হয়েছিল, প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থ ও পণ্য-সেবার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের দ্বিতীয় দিনেই এ কার্ড বাস্তবায়নের কাজে গঠন করা হয়েছে উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কমিটিতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী, উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন ও রেহান আসিফ আসাদ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিব, অর্থ সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, পরিকল্পনা সচিব এবং সমাজকল্যাণ সচিব।
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের একটি উপযুক্ত নকশা প্রণয়ন এবং সুবিধাভোগী নির্বাচন পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। প্রাথমিকভাবে দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটিতে একটি করে উপজেলা নির্বাচন করে সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে তা শুরু করার কথা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র ও ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডেটাবেজের আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের একটি ডিজিটাল এমআইএস প্রণয়নের সুপারিশও করবে কমিটি। এছাড়া নারীদের জন্য বিদ্যমান কোনো কর্মসূচিকে ফ্যামিলি কার্ডের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, তাও পর্যালোচনা করা হবে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কমিটির সভা প্রয়োজন অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে। প্রয়োজনে কমিটি নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ শুরু করেছি। নীতিমালা চূড়ান্ত হলে বিস্তারিত জানানো হবে।’ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়টি বিস্তারিত উল্লেখ আছে। এটি কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে আজ আলোচনা হয়েছে। এটি একটি সর্বজনীন কর্মসূচি। ধাপে ধাপে হতদরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত—সবাইকে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে।’ পটুয়াখালী-৪ আসন থেকে বিজয়ী বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘বিশ্বের নানা দেশে গবেষণায় প্রমাণিত—নারীর হাতে সরাসরি সহায়তা দিলে তার সুফল শুধু নারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা পৌঁছে যায় সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের পুষ্টি এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায়। নারী সহায়তা পেলে তা অপচয় হয় না। বরং ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হয়।’ এ বিষয়ে বিএনপি নেতা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার এক লেখায় বলেছেন, এই কার্ডের শক্তিশালী দিক হলো এর সর্বজনীনতা। এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রয়োজন হবে না, এটি হবে নাগরিকের অধিকার। এদিকেম অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার জানিয়েছেন, সরকারের পরিকল্পনামাফিক এই প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ করা হবে। এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলা ঠিক হবে না।
